একজন অকম্মার জীবনচরিত

ছোটবেলায় একটা ছড়া পড়েছিলাম – “দিতে হবে অকম্মার হাতে”। ছড়ার সাথে সাথে সেই ছড়ার বইটায় অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি ছিলো। আমার এখনো মনে আছে আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওই বইটার ছবিগুলো দেখতাম আর আম্মু আমাকে ছড়াটি পড়ে শুনাতো। আমি হঠাত্‍ হঠাত্‍ অবাক হয়ে ভাবি, ওই দিনগুলো আর কোনদিন ফিরে আসবে না! ছড়াটা ইন্টারনেটে খোঁজ করতেই পেয়ে গেলাম এখানে

শুনেছ তো?
চিঠি নিয়ে ঘুরছে পিয়ন পাড়াতে
কে জানে চিঠি আছে বা কার বরাতে!
দলা মোচড়া খাম
আর তাতে লেখা আছে
দিতে হবে অকম্মার হাতে!
একতলাতে দিলো পিয়ন টোকা
দেখে ও মা! নিজের হাতে খেতে জানে না খোকা।
গল্প বলে খাওয়াতে হয় বুলিওন
“নাও অকম্মার চিঠি”-বললে পিয়ন
চমকে খোকা নিজেই নিলে চামচ
বললে মা-
“নেই এখানে তেমন অকম্মা।”
উপরে থাকে আন্দ্রেউস্কা
উপরে পিয়ন এলো
ঘরটা জুড়ে খেলনা তার ছড়ানো এলোমেলো
কাচুমাচু আন্দ্রেউস্কা
শুনেই ঠিকানা
“না না কাকু আমি অকম্মা না
আমি কাকু এই বাড়িটা বানানো শেষ করে
গুছিয়ে সব তুলে রাখব
রইবে নাকো পড়ে।”
গেল পিয়ন পাশের ফ্ল্যাটে
তখন সবে ঘুমটি ভেঙ্গে উঠেছে খোকন
দিদি তাকে মোজা পরাচ্ছে বাহারে
খোকন মনি এলিয়ে আছে চেয়ারে
বলল পিয়ন, “এই পেয়েছি খেই
শ্রী অকম্মা থাকেন তবে
হয়ত এখানেই।”
শুনেই খোকন হয়ে উঠল সোজা
বলে উঠল পরতে পরতে মোজা
“এই দেখুন না, বলেন এসব কী যে
পোশাক আমি পরিই নিজে নিজে।”
অন্য এক ফ্ল্যাটে পিয়ন
গেল তারপরে
দেখে রান্নাঘরে ধোয়া হয়েছে
ডিশ- প্লেট এখন
মা-মেয়েতে মুছে রাখছে একগাদা বাসন।
নেমেই এলো পিয়ন
আরে আরে
একটু হলেই পড়ত গিয়ে
বরীয়ারের ঘাড়ে।
তিন বছুরে ছোট্ট ছেলে
জল দিচ্ছে গাছে
নাহ! এখানে নেই অকম্মা
কে জানে কোথায় আছে!
জিড়িয়ে পিয়ন ফের চলল
অকম্মার খোঁজে
পাবে কি তাকে
এতই সহজে!
ঠিকানা খুঁজে ঘুরছে চিঠি
তামাম দুনিয়ায়
দেব কি বলে
কি আছে চিঠিটায়?
খামের মধ্যে লেখা আছে
একি??
ছি! অকম্মা! কী লজ্জার কথা
বল দেখি!
আর তোমাদের কাছে আমার বায়না
চিঠি যেন ঠিকানা তার কোথাও খুঁজে পায় না।

মাঝে মাঝে আমার নিজেকে একটা অলস আর অকম্মা বলেই মনে হয়। কষ্টকর কোন কাজই যেন আমি করতে পারিনা। এই আলসেমির জন্য জীবনে কখনোই কোনও পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে পারিনি। কত পরীক্ষা যে অসম্পুর্ন রেখে এসেছি এ জীবনে তার কী ইয়ত্তা আছে? এর পেছনেও সেই আলসেমি। শেষ মূহুর্তের জন্য রেখে দিয়ে আর শেষ করতে না পারা – এই ছিলো আমার কুয়েটজীবনের সমস্ত পরীক্ষার সার অভিজ্ঞতা। আর সেই আলসেমির ফলাফলও পেয়েছি একেবারে হাতেনাতে – সিজিপিএ চারের মধ্যে ৩.৩৩। এর পর ঘটলো এক অদ্ভুত ঘটনা। কিভাবে যেন এরিক্স্সন নামের একটা টেলিকম্যুনিকেশন কোম্পানীতে চাকরি হয়ে গেলো। এই চাকরির জন্য gre পরীক্ষার স্টাইলে একটা পরীক্ষা দিলাম। পরীক্ষা দিয়েই বুঝলাম চরম খারাপ হয়েছে। 2007 সাল। মাত্র পাস করে এসেছি, তাও আবার কুয়েট থেকে – জানি অনেকদিন বেকার থাকতে হবে। তাই তেমন একটা মন খারাপের বালাই তখন ছিলোনা। সারাদিন কম্পিউটারে হাবিজাবি করি আর বিকালে প্রতিবেশী বন্ধু নাহিদের (যে কিনা কুয়েটেও আমার সাথে একি ক্লাসে ছিলো) সাথে ধানমণ্ডি লেক এলাকায় ঘুরতে যাই। এমনি একদিন  ঘুরতে গিয়ে একটা ফোন আসলো যে আমার নাকি Ericsson এ ইন্টারভিউ দিতে হবে। আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। এত খারাপ পরীক্ষার পরও ইন্টারভিউ! তবে পরীক্ষা যে আসলেই খারাপ হয়েছিল তা বুঝতে পারলাম ইন্টারভিউয়ের সময় এইচআর হেড মোহাম্মদ সাকিবের কথায়।

এইচআর : আচ্ছা তুমি এই পরীক্ষায় কত পেয়েছ বলে মনে কর?

আমি: আমি ঠিক বুঝতে পারছিনা।

এইচআর: তারপরও। কত পেয়েছো কোনও রকম আন্দাজ করতে পারো? তোমার কী মনে হয় – নববুই উঠবে? (উল্লেখ্য পরীক্ষা ১০০ তে ছিলো)

আমি: নাহ এতো হোবেনা। ৭০ এর মত হতে পারে

এইচআর: ৫৫ … তোমার কী মনে হয় এতো খারাপ করার কারণ কী? অনেকেই ৯৯ কিংবা ১০০ পেয়েছে।

আমি: আসলে আমি কখনো এমন GRE স্টাইলে পরীক্ষা দেইনি। আর পরীক্ষা যে এমন হবে এমন ধারনাও আমার ছিলো না … … …

এধরনের ইন্টারভিউয়ের পরও আমার চাকরিটা হয়েছিল। পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছিলাম যে তখন গনহারে (ওইবার একসাথে ২৭ জনকে নিয়েছিল Ericsson … পরে একবার নিল ৫০ জন) লোক নেয়ার পেছনে এরিক্সনের উদ্দেশ্য ছিলো সস্তায় শিক্ষিত “লেবার” নিয়োগ করে অন্যান্য দেশে চালান দেয়া। যাই হোক আমাদের দেশের চাকরি বাজারের জন্য বেপারটা নিতান্ত মন্দ ছিলনা।

কিন্তু আবার  সেই আলসেমি রোগ আমার পিছু নিল। Ericsson এর চাকরি কষ্টকর বলে এক বছরের মাথায় সেটা ছেড়ে দিয়ে বাসায় বসে থাকলাম (এখানে উল্লেখ্য যে আমাদের বিদেশী ম্যানেজারের অদক্ষতার কারণে অথবা নতুন কোম্পানী হবার কারণে প্রথম ৩/৪ মাস আমাদের কিছুই করতে হয়নি। তখন পর্যন্ত চাকরিটা খারাপ লাগতো না।)। আমার চারিদিকের অনেক বন্ধুবান্ধব তখন IELTS দিচ্ছে। তাদের ইচ্ছে প্রবাসী হবে। এই মরার দেশে থেকে ধুঁকে ধুঁকে মরার কোনো মানে হয় না। আমি সাধারণত একটা ঘরকুনো নির্বোধ হিসেবেই জীবন কাটাই। আমার ঘর আর ঘরের কোনের কম্পিউটার স্ক্রীন ছাড়া আর কিছুর দিকে তাকানোর খুব একটা প্রয়োজন অনুভব করিনি কখনো। সংসারের তাবত অর্থসংকটের আঁচ আমাদের গায়ে খুব একটা পড়তে দেননি আমাদের বাবা-মা। আর তা ছাড়া hsc পরীক্ষার পরপরই একরকম ঘরছাড়া হয়ে খুলনা থাকার কারণে বাসায় অর্থকষ্টের পরিমানটা সবসময় নজরে পরেনি। এরিকসনের চাকরিটাও নির্ঝঞ্ঝাটই ছিল। মাস শেষে টাকার অঙ্কটাও নেহায়েত কম ছিল না। তাই দেশে থাকলে কেন ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে এবিষয়টা সম্পর্কে খুব একটা পরিচিত ছিলাম না। তবে আমার বাবা-মা সরকারী চাকরিজীবি ছিলেন। একারণে তাদের কত সংগ্রাম করতে হচ্ছে, আর দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে চাকরিবাকরি করাটা কি পরিমান কষ্টকর তার বয়ান ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি। তাছাড়া ভালো চাকরি ছেড়ে বেকার বসে থাকার গঞ্জনাও একপর্যায়ে অসহ্য মনে হতে লাগলো। অকম্মা হবার অপরাধবোধটাও মনে হয় একটু একটু করে কাজ করা শুরু করলো। এসব থেকেই একদিন GRE বইটা নিয়ে বসলাম।

আমার খুলনার বন্ধুরা যখন IELTS দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া যাবার জন্য, তখন আমার GRE নিয়ে বসাটা একটু অস্বাভাবিকই বটে।অন্য সবার মত আমিও বিশ্বাস করতাম আমাদের মত দুর্বল স্টুডেন্টদের জন্য পড়াশোনা করতে আমেরিকা যাওয়ার চিন্তা করাটাই একটা বোকামি। যেদিন বুয়েটের result দেখতে গিয়েছি, সেদিনই কপালে ছাপমারা হয়ে গেছে যে ওসব আমার জন্য না। কিন্তু এই অস্বাভাবিক চিন্তাটাই আমার মাথায় ঢোকানোর কষ্টস্বাধ্য কাজটা তখন করেছিল আমার স্ত্রী – চৈতি। যদিও তখনও আমাদের বিয়ে হয়নি, কিন্তু বন্ধুহিসেবে সে আমার পাশে ছিল সেই KUET এর ১ম ইয়ার থেকেই। যাই হোক, GRE বই নিয়ে বসাটাই তো আর সব না, এটা পড়তে হবে, প্র্যাকটিস করতে হবে। আবার শুরু হলো অকম্মাগিরি। কিন্তু ওই অপরাধবোধের তাড়নায় একটু একটু করে পড়তেও থাকি। সবচেয়ে বড় বাধা হলো ৩০০০ শব্দ মুখস্ত করা। মুখস্তবিদ্যা আমার সবসময়ই খারাপ, সুবিধা করে উঠতে পারছিনা। তার ওপর যে ম্যাথকে অন্যান্য প্রকৌশল ছাত্র/ছাত্রীরা বলে “পানির মত সহজ” – সেটা নিয়েও আমার মাথা ঘুরে যাওয়ার মত অবস্থা – কিছুই পারিনা। সময়ের মধ্যে শেষ করা তো অনেক পরের ব্যাপার। তবে ইন্টারনেট ব্রাউসিং করার অভ্যাস থাকায় বিভিন্ন অনলাইন ফোরামে আমার মত দুর্বল ছাত্র/ছাত্রীদের কাছ থেকে উপদেশ পেয়ে পেয়ে একটা পর্যায়ে পরীক্ষায় বসার সিদ্ধান্তটা নিয়েই নিলাম। পরীক্ষা শেষে কম্পিউটারের স্ক্রীনে result ফুটে উঠলো – যথারীতি ভার্বালে পেয়েছি ৮০০ তে মাত্র ৪৫০ — কিন্তু তারপরও আমি উত্তেজিত – ম্যাথে পেয়েছি ৮০০ তে ৮০০।

যাই হোক, এর পর কিভাবে কিভাবে জানি আমেরিকায় funding ও হয়ে গেল। আমি আর আমার স্ত্রী চলে আসলাম যুক্তরাষ্ট্রের Tennessee রাজ্যের মেমফিস নামে একটা ছোট্টশহরে। তবে এখানে এসেও আমার অকম্মাগিরিতে ভাটা পড়লনা …

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s